বৃহস্পতিবার, ১৫ জুলাই, ২০২১

কথোপকথন : স্বর্ণেন্দু সেনগুপ্ত ও কৌশিক বাজারী

কথোপকথন :  

স্বর্ণেন্দু সেনগুপ্ত ও কৌশিক বাজারী ।

 

 

(আমাদের এই কথোপকথন পর্যায়টি  ঘটেছিল কয়েকবছর আগে। স্বর্ণেন্দুর একটি কবি সম্মান প্রাপ্তি উপলক্ষে,  একটি পত্রিকার সম্পাদক বন্ধুর অনুরোধে।  ঘটনাচক্রে তা আর প্রকাশিত হয়নি। আমার গুগুল ড্রাইভে থেকেই গেছে কথাবার্তাগুলি। মনে হল ব্লগে তুলে বন্ধুদের পড়তে দিই। তাই...

--কৌশিক বাজারী)




কৌশিক বাজারী :

আচ্ছা, স্বর্ণেন্দু, শুরু করি তাহলে ? প্রশ্ন তো একটাই সকলে করে, কেন কবিতা লেখো? ত একজন এর উত্তরে বলেছিলেন সিনেমা বানাতে পারিনা, ছবি আঁকতেও পারি না, অগত্যা কবিতা! গান গাইতে পারলে হয়ত কবিতা লেখার প্রয়োজন হতই না আর...। তোমার ব্যাপারটা কী? মানে ভিউটা, একটু বল, অন্য কারো কথা না, তোমার কথা, কীভাবে এসে পড়লে এই জগতে?


স্বর্ণেন্দু সেনগুপ্ত:

কেন কবিতা লিখি, এবং কীভাবে এসে পড়লাম এ জগতে, দুটো প্রশ্ন দু-রকম হলেও, এখানে বোধহয় একটি প্রশ্নেরই বাতাবরণ গড়ে তুলেছে ।  এই যে কেন লিখি কবিতা,বা কবিতা লিখে কী হতে পারে এর উত্তর ভাবতে গিয়ে, যেগুলো মনে আসছে, কবিখ্যাতি, সবার মাঝে থেকেও সবার থেকে আলাদা, বা বিশিষ্ট হয়ে ওঠা, বা তুমি যেভাবে বললে, আর অন্যকিছু পারিনা বলেই কবিতা লেখা ইত্যাদি, এগুলো সবই আসলে খুব পরিণত বয়সের চিন্তা, তাই এই ধরনের উত্তর থেকে দূরে থাকতে চাইছি । দূরে থাকতে চাইছি কারণ,  আমি প্রথম যেদিন কবিতা লিখেছিলাম, পঞ্চম শ্রেণিতে পড়ি তখন আর এভাবেই নির্ধারিত হয়ে গেল আমার পরবর্তী জীবনের গতিপ্রকৃতি, সেদিন কি আর বুঝতাম এতসব কিছু্র মানে, কিন্তু সেদিনের সেই ঘটনাটি তো অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ, সেই কবিতা লিখে ফেলাটি ! সেদিনের প্রথম কবিতার আমি-ই তো আজও এগিয়ে চলেছে একটি পরিণতির দিকে, বিরামহীন । কবিতা কেন লেখে সেদিন বোঝার বয়স ছিলো না, কিন্তু না থেমে লিখে যেতে যে চাইতাম তা জানি, কারণ প্রতিদিন সন্ধেবেলা ঠাকুর প্রণামের সময়, আমার একটাই ছিল নিয়মিত প্রার্থনা, যে আমি যেন লেখক হয়ে উঠতে পারি !

সুতরাং লিখি, এবং লিখে যে যাচ্ছি এটা সত্য । কিন্তু কেন লিখি ? আজকের আমি সেদিনের আমির দিকে তাকিয়ে রয়েছে, সেদিনের আমি আজকের আমির দিকে তাকিয়ে রয়েছে, কিন্তু কেউ কাউকে এর প্রকৃত উত্তর বলে দিতে পারছে না!


কৌশিক :

হ্যাঁ, একটা অন্তর্গত সুরবোধ, যা কারো কারো ভেতরে বেজে ওঠে! সেটাই তোমার কথা থেকে বোঝা গেল। হয়ত খুব শিশুকাল থেকেই । তবে সবাই হয়ত দীর্ঘকাল বহন করতে পারেনা সেই সুর, হয়ত পারিপার্শ্বিক এর চাপ তাকে নষ্ট করে । অবশ্য এতে কোনো অসুবিধা বোধ হয় না । অর্থাৎ বিষয়টা একেবারেই ভেতরের, অন্তরের একটা রহস্যময় জগত, যার নাগাল সচেতন মন পায়না, তাইতো ?



স্বর্ণেন্দু :

এই কয়েকদিন আগে একটা পুরানো ডায়েরি খুঁজে পাই, এই ডায়েরি থেকে আমার লেখালিখির প্রথমদিকের একটা ঘটনা, সামান্যই সে ঘটনা, মনে পড়ে যায়! সপ্তম বা অষ্টম শ্রেণিতে পড়ি তখন, সে সময়ের ডায়েরি এটি । কবিতা লিখতাম, এবং কবিতার নিচে, কবির নাম লেখা হয় যেখানে, উলটো পালটা নাম লিখে রাখতাম, নিজের নাম লিখতাম না । আমি ব্যতীত অন্য কেউ যদি আমার এই একান্ত ব্যক্তিগত জীবনটির খোঁজ পেয়ে যায়, এমন একটি সংকোচের হাত থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্যই এই বিভিন্ন নামের আড়াল খুঁজে নেওয়া । ক্রমে আর এই সংকোচটি থাকল না । আমার যে একটি ব্যক্তিগত জীবন আছে, সেখানে আমি স্বাধীন, আমার কথাগুলি, ভাবনাগুলি  একান্তভাবে আমারই, আমার ভাবনাগুলি আমার মতো করে ব্যক্ত করতে পারি, এগুলি সবাইকে জানাতে আর সংকোচ থাকল না । তাই কবিতার নিচে নিঃসংকোচে যেদিন প্রথম লিখে দিতে পারলাম নিজের নাম, সংকোচ বিসর্জনের থেকেও সেদিন আমার কাছে বেশী করে গুরুত্ব পেল যা, তা হল একান্ত ব্যক্তিগত ও স্বাধীন এক জীবন যাপনের ইচ্ছে! তোমার প্রথম প্রশ্নের হয়তো এটিও আর একটি উত্তর, একটা স্বাধীনতা বোধ, আমরা সকলে যা প্রত্যাশা করি, তা আমি এখানে সবচে বেশী অনুভব করে থাকি । তাই এখন এটি শুধু আর অন্তরের রহস্যময় জগতের ব্যাপার থাকল না,  বাইরের একটি কারণও খুঁজে পাওয়া গেল বোধহয়, তোমার এই দ্বিতীয় প্রশ্নের পরিপ্রেক্ষিতে ।


কৌশিক :

দেখ, ব্যক্তিগত জীবন যাপনের বোধ, একটা বয়সের পর আসেই । প্রকাশেচ্ছা, নিজেকে উপস্থাপন, সেটা আবার কিঞ্চিত আলাদা । অর্থাৎ আমারও কিছু বলার আছে, বলতে চাই, এই ইচ্ছা । সকলেই হয়ত পথ খুঁজে পায়না । তবু খোঁজটা থাকে আজীবন । আচ্ছা তুমি কবিতায় মূলত কী বলতে চাও? এবং আরো বড় কথা হল, কিছু কি আড়াল করতে চাও? প্রশ্ন কি ঠিক করতে পেরেছি?


স্বর্ণেন্দু :

নিজের কথা নিজের মুখে বলার সংকোচটি সহজাত হলেও, আমরা আত্মজীবনী লিখি । কারণ, আত্মজীবনী প্রথমত নিজের চোখ দিয়ে নিজেকেই দেখা, দেখতে দেখতে নিজেকে জানা ও বোঝা, অন্য আর পাঁচজনকে জানানো ও বোঝানোর ব্যাপারটি অনেক পরে আসে । আত্মজীবনী রচনার মতো আমার কাছে কবিতা লেখাও আসলে নিজের চোখ দিয়ে নিজেকেই দেখা, নিজেকে বোঝা, যদি কিছু বলার বিষয় থাকে সে বলাটাও নিজেকেই বলা । আমার কবিতা কিছু বলতে চায় না, যদিও কবিতা নিয়ে কিছু কথা বলাই যায় । যে অনুভূতিগুলির কথা, হঠাত হঠাত উদ্ভাসনগুলির কথা কাউকে বলা যায় না, অথচ নিজেকে বলতে কোনো বাধা নেই, লেখার ছলে সেগুলি নিজেকেই বলে ফেলা হয় আসলে । কারণ সেগুলি না লিখলে, না বললে, চিরকালের জন্য অধরাই থেকে যেত তারা, সেগুলি-ই  আমার কবিতা, তারপরেও আরো অনেক অনেক অধরা থেকে যায়, সবগুলোকে তো আর কবিতায় ধরতে পারি না! কিন্তু একজনের সব কথাই তো আর নিজেকে বলার জন্য হতে পারে না, আমারো কিছু কথা আছে যা অপরকে বলা যায় বা বলতে চাই । সে সকল কথার জন্য আমি গদ্য লিখি, সেখানে পাঠকের সঙ্গে সরাসরি সংযোগ স্থাপন করতে চাই, আমার বক্তব্যটি সরাসরি তাঁর কাছে পৌঁছে দিতে চাই ।


কৌশিক :

আচ্ছা, ধরো, পৃথিবীতে এক বিশাল বিপর্য্যয় ঘটে গেছে! আনবিক যুদ্ধে, বা মহাশূন্য থেকে খসে পড়া গ্রহাণু সংঘাতে মানব সভ্যতা শেষ হয়ে গেছে! কেউ নেই । বা থাকলেও কোথাও, তুমি তা জানোনা । একা, পোশাকহীন, ঠাঁইহীন ঘুরে বেড়াচ্ছ।
ধরা যাক,প্রকৃতি খাদ্য যোগাচ্ছে ।

কবিতা লিখবে ?



স্বর্ণেন্দু :

চূড়ান্ত সংকটের হাত থেকে মুক্ত হওয়ার জন্য মানুষ শিল্পের সম্মুখীন হয়, এমন উদাহরণ অনেক পাওয়া যায় । কিন্তু তুমি যদি জিজ্ঞেস করতে প্রচণ্ড বৈভব, সুখ, স্বাচ্ছন্দ্যের মধ্যেও আমি কবিতা চর্চা চালিয়ে যেতে পারবো কী না, তার উত্তর দেওয়া আমার ক্ষেত্রে আরো কঠিন হত, আমাদের সামনে তেমন দৃষ্টান্তও খুব একটা আছে বলে মনে হয় না । এ প্রসঙ্গে, এই মুহুর্তে মনে পড়ছে, মোয়াজ্জাম বেগ এর কথা । আমেরিকা অধিকৃত কিউবার গুয়ান্তানামো উপসাগরের তীরে অবস্থিত কুখ্যাত ডিটেনশন ক্যাম্পে, সন্ত্রাসবাদী সন্দেহে, মোয়াজ্জাম বেগ তিনবছর বিনা বিচারে কারারুদ্ধ ছিলেন । অকথ্য, অবর্ণনীয় মানসিক ও শারীরিক অত্যাচারের মধ্য দিয়ে  তাঁকে এখানে কাটাতে হচ্ছিল যখন, কবিতা লেখা শুরু করেন! এই  কারাগারের ভিতরের অবস্থা, মানব সভ্যতা শেষ হয়ে যাওয়ার যে কথা তুমি বলেছ, তার চেয়েও খারাপ বই ভাল নয় । হিটলারের কনসেনট্রেশন ক্যাম্পের ভিতরেও যে কবিতা লেখেন নি কেউ, ব্যাপারটি আদৌ এমন নয়! বেগ এর বিরুদ্ধে আনা কোনো অভিযোগই প্রমাণিত হয় নি, শেষপর্যন্ত তিনি মুক্তি পান ।

এক সাক্ষাৎকারে কবিতা লেখার বিষয়ে জানতে চাওয়া হোলে, মোয়াজ্জাম বেগ বলেছিলেন...‘I liked writing poetry, but having said that, poetry is something I only discovered in Guantánamo, and it was solitary confinement that produced that response in me.’ বাস্তবিকই এক বিচ্ছিন্ন কারাগারে তিনি প্রথম কবিতা লেখা শুরু করেন, সম্পূর্ণভাবে নিঃসঙ্গ অবস্থায় । মুক্তির পরে, আরও কবিতা লিখতে চান কী না জিজ্ঞেস করা হোলে, তিনি বলেন...‘It’s sad, because it means that I need that isolated environment to write, and I can’t do it in just any situation’।



কৌশিক :

আমার প্রশ্নের মূল জায়গাটা, স্বর্ণেন্দু, একটু আলাদা ছিল, একটু নয়, পুরোটাই, হয়ত আমি বোঝাতে পারিনি, আসলে বৈভব না অভাবের প্রশ্ন নয় এটা, আমি বলতে চেয়েছি পৃথিবীতে একা একজন মানুষের কথা, যার কথা শোনার জন্য আর কেউ নেই তার সামনে, সেই তখন, যখন কবিতা বা যেকোনো শিল্প আর কাউকে দেখানোর বা শোনানোর নেই, কী করবে সে? যদি তুমি হও সেই ব্যক্তি, কী করবে ?



স্বর্ণেন্দু :

তুমি পাঠকহীনতা কে গুরুত্ব দিতে চেয়েছ, আমি গুরুত্ব দিয়েছি সংকটটাকে । সেদিক থেকে দেখলে, একজন লেখকের সামনে আর যখন কোনো পাঠক নেই, এটিও আর এক ধরনের সংকট ! লেখকের সংকট । সেদিকেই হয়তো আমাদের সাহিত্যের ভবিষ্যৎ এগিয়ে চলেছে, যা অনেকেই ভয় পাচ্ছেন, এমন একদিন এগিয়ে আসছে যখন কেউ আর সাহিত্য পাঠ করবে না । তখন এটা শুধু  একজন লেখকের সংকট হতে যাবে কেন, সভ্যতারই তো সংকট এটা !

তুমি একেবারে ব্যক্তি আমার কথা জানতে চেয়েছ— যে আমি কী করব তখন— আর সত্যি-ই তা আমি এড়িয়ে যেতে চেয়েছি আমার আগের উত্তরে । একটি কাল্পনিক পরিস্থিতি সম্পর্কে কিছু বলতে যাওয়া মানে, আরও বেশী করে সেই কল্পনারই আশ্রয় নিতে যাওয়া, আমি কিছুতেই বুঝতে পারব না, সে কল্পনা কতদূর প্রকৃত বাস্তবকে অনুসরণ করছে । তাই সেই প্রশ্ন থেকে মুখ ঘুরিয়ে চারপাশটাকে দেখে নিতে চেয়েছি, যে প্রায় একই ধরনের পরিস্থিতির মধ্যে কী কী ঘটে থাকে, সেখান থেকে একটি সিদ্ধান্তে আসতে চেয়েছি । আর একটি কথা বলা হয় নি, সম্পূর্ণ আইসোলেশনের মধ্যে সেই কয়েদি কবিরা, নুড়ি দিয়ে, কাঁকর দিয়ে, কারাগারের দেওয়ালে মেঝেতে কবিতা লিখত । কারণ, প্রথম প্রথম লেখার কোনো সরঞ্জাম ছিল না তাদের । দেওয়ালে, মেঝেতে লেখা কবিতাগুলি সময়ের সঙ্গে সঙ্গে মুছে যেত দেওয়াল থেকে, মেঝে থেকে, একটি পাঠকেরও মুখ দেখতে পেত না সেগুলি যেমন, কোনো পাঠক পড়বে এমনটা ভেবেও নিশ্চয় লেখা হত না কবিতাগুলি ! সুতরাং লেখা যায়, একেবারে নিজের জন্যও লেখা যায় তাহলে ! লেখা যখন যায়, আমিও কবিতাই লিখব তখন, একা একাই মুছে দেব সেগুলি , কারণ বেঁচে থাকা ব্যতীত অন্য কোনো কাজই তো রইল না আর ।




কৌশিক :

খুব সুন্দর বলেছ স্বর্ণেন্দু ! সত্যিই ত, নিজেকেই নিজে বলে যাওয়া এইসব কথা! কবিতায় ছবিতে গুহাশিল্পে, প্রসঙ্গক্রমে মনে পড়ছে, ‘সুতনুকা নামে সেই দেবদাসী’ অজ্ঞাত কোনো কবি যাকে পাথুরে লিপিতে প্রেম জানিয়ে ছিল হাজার সহস্র বছর আগে! তাহলে ভাই এই পুরস্কার খ্যাতি যশ এর সঙ্গে কোথায় কোন সম্পর্কে তুমি যুক্ত করবে আজকের শিল্পকে ? কিছু আলোকপাত কর দেখি এর উপর ?


স্বর্ণেন্দু :

এই বিষয়টি, এমন কী জগতের কোনো বিষয়ের ওপরেই, যথাযথ আলোকপাত করবার মেধা ও পাণ্ডিত্য আমার নেই । এখন ঘটনাচক্রে তুমি প্রশ্নদাতা আর আমি উত্তরদাতা, উল্টোটিও হতে পারত । আমাকে এখানে কিছু বলতে হচ্ছে, যদিও বলার আগে, বলার সময়ে, এবং বলার পরেও সেই ‘বলা’ নিয়ে সংকোচ কিছুটা হলেও থেকেই যাচ্ছে। থাকবেও ।

এবার কাজের কথায় আসি,শিল্পচর্চা করে কেউ কেউ পুরস্কার খ্যাতি ও যশের অংশীদার হয়ে ওঠেন এটি ঠিক, তা বলে শিল্প চর্চার লক্ষ্য কখনোই পুরস্কার খ্যাতি বা যশ হতে পারে না । আবার, শিল্প চর্চার সরাসরি ফল হিসেবেও এগুলোকে দেখা যায় না, বাংলাভাষায় লিখে কজনই বা আর পুরস্কার খ্যাতি বা যশের মুখ দেখেন! কেউ কেউ দেখেন, এটিও একরকম সত্য, কিন্তু এই সত্যের জন্য অপর সত্যগুলো মূল্যহীন হয়ে যায় না । এই পুরস্কার খ্যাতি যশকে গ্রহণ করবার ধরনের মধ্যেও তারতম্য দেখা যায় । রবীন্দ্রনাথ তিনটি-ই পেয়েছিলেন, এ নিয়ে আমাদের মধ্যে কোনো অসূয়া নেই, সহনশীলতা রয়েছে । আজকের সময়ের কেউ তা পেলে,  এ বিষয়টিকে আবার এতটা উদার দৃষ্টিতে দেখতেও পারি না । অবশ্য তার জন্য কিছু যাবে আসবে না, এই পাওয়া না-পাওয়া, দেওয়া না-দেওয়া, ইত্যাদির প্রাতিষ্ঠানিক এবং-অথবা রাজনৈতিক খেলাটি চলতেই থাকবে ।

কিন্তু কথা হল, এইসব বিষয় নিয়ে ভাবনা চিন্তা করা আমাদের জন্য কতটা জরুরি ? আলোচনার মাঝে তারা হঠাত এসে ঢুকে পড়ছে যখন, তাদের একটি প্রভাব রয়েছে আমাদের চিন্তায়, কথাবার্তায়, এটিও অস্বীকার করার উপায় নেই আর । এইসব প্রভাব থেকে যত দূরে রাখতে পারবেন একজন নিজেকে, ততটাই গভীর ও একাত্ম হয়ে উঠবেন তিনি, আমার এটুকুই বিশ্বাস । আবার দেখ, আমরা যে সকল কবি-লেখকের সঙ্গে ঘর করি, আমি জানি তুমিও, তাঁদের সিংহভাগই তো পুরস্কার খ্যাতি ও যশের বাইরে থেকেই সারাজীবন শিল্পচর্চা করেছেন, বা এখনও করছেন । এর জন্য তাঁদের শিল্পচর্চায় তো কোনো ব্যাঘাত ঘটেনি, তাঁদের গ্রহণ করতেও আমাদের কোনো সমস্যা হয়নি, আমরাই তো খুঁজে খুঁজে গিয়েছি তাঁদের কাছে । শিল্পীর থেকে, শিল্পর থেকে, কোনো পুরস্কার-ই কখনো বড় হতে পারে বলে আমার মনে হয় না ।



কৌশিক :

দেখ স্বর্ণেন্দু, এখানে আমারও একটা কথা বলার ছিল, আমার মতামত এখানে যদিও বেশি কাম্য নয়, তবু যেহেতু এটা প্রথাগত সাক্ষাতকার নয় তেমন, দাদা - ভাই এর কথোপকথন বলা যায়, তাই তোমার কথার সূত্রে বলি-- প্রথমত এই পুরস্কার শব্দটাই আমার কাছে খুব ফিউডাল গন্ধযুক্ত মনে হয় । যেকোনো কবিশিল্পী বিজ্ঞানী অর্থাৎ সৃজনশীল মানুষকে পুরস্কৃত করার কিছু থাকে না । কেইবা তাকে পুরস্কৃত করতে পারে! আমরা শুধুমাত্র তাকে সম্মান জানাতে পারি । নত হতে পারি তার কাছে, যে প্রকৃতই কল্যানের কাজে ব্রতী, এটুকুই ।




স্বর্ণেন্দু :

সুন্দর বলেছ, কৌশিকদা । এই বিষয়ে তোমার একটি লেখাও ছিল, মনে আছে আমার, লেখাটি খুব ভাল লেগেছিল । যাই হোক, কাজের শেষে সম্মান বা স্বীকৃতি স্বরূপ পুরস্কার আসে, তাই এসব কথাবার্তা প্রকৃত অর্থেই শেষের কথা, শেষ নিয়ে কথা । আমরা এখন শুরুর দিকে আছি, কবিতায় আছি, কবিতা নিয়েই কথা বলি চলো —


কৌশিক:

আচ্ছা, একটা প্রশ্ন। এই যে কবিতার বিবর্তন, চর্যাপদ থেকে, বৈষ্ণবকাব্য, মঙ্গলকাব্য হয়ে মাইকেল, রবীন্দ্রনাথ, জীবনানন্দ পেরিয়ে বিনয় গৌতম বসু বা চৌধুরীদের সময়ে এসে পৌঁছল বাংলা কবিতা, এবং এখন প্রবহমান, এই প্রবাহে সমকালীন ধারাটিকে কোথায় রাখবে? নিজেকে এর মাঝে কোথায় আবিষ্কার করতে চাও? কিছু বলবে?


স্বর্ণেন্দু :

প্রবাহ, প্রবহমান, ধারা এই শব্দগুলি মিলেমিশে, আমি একটি জলধারার ছবিকেই দেখতে পাচ্ছি এখানে । বাংলা কবিতার ধারা, বিরামহীন গতিতে এগিয়ে চলা একটি নদীর বয়ে যাওয়ার মতো, চর্যাপদের পদকর্তারা যেমন, একেবারে আমাদের সময়ের গৌতম বসু, গৌতম চৌধুরী প্রমুখ সে ধারায় সামিল রয়েছেন, তুমি বলেছ । তাহলে সমকালীন ধারাটিকেও তো সে প্রবাহেরই অন্তর্গত করে দিলে তুমি ! এখন সমকালীন ধারা বলতে যদি গৌতম বসু বা চৌধুরীর  পরবর্তী সময়ের লেখালিখির কথা বলতে চাও, তাহলেও আমি একই কথা বলব, যে এটিও সে প্রবাহেরই অন্তর্গত রয়েছে । তোমার এই প্রশ্নটি আমাকে এমন একটি ছবির সামনে পৌঁছে দিল আসলে ।

বাংলাকবিতার সঙ্গে আন্তরিকভাবে জুড়ে থাকার সৌজন্যে, এ বিষয়টি নিয়ে আমিও যে একেবারে ভাবিনি এমন নয়, কিন্তু আমার ভাবনার ছবিটি সামান্য আলাদা । সেখানেও প্রবাহ আছে, তার প্রবহমানতা নিয়েই আছে, ধারাও আছে, কিন্তু কোনো নির্দিষ্ট একটি জলধারা নেই, একাধিক, বলা ভাল যতজন কবির কথা আমরা ভাবতে পারি ঠিক ততগুলি জলধারাই এখানে রয়েছে । একটি বিন্দু থেকে উৎসারিত হয়ে, একক ও বিচ্ছিন্ন অবস্থায় যে যার নিজের পথটিকে গড়তে গড়তে, ভাঙতে ভাঙতে, এগিয়ে চলেছে । আজ আমার যা মনে হয়, কবিতার যাত্রা বা একজন কবির যাত্রা আসলে এক  নিঃসঙ্গতার যাত্রা, একাকিত্বের যাত্রা । এখানে রবীন্দ্রনাথ একটি জলধারা, জীবনানন্দ আর একটি, বিনয় মজুমদার আরও একটি, এবং এভাবেই গৌতম বসু, গৌতম চৌধুরী প্রমুখ, এক একজন এক একটি একক ও বিচ্ছিন্ন জলধারা, সামনের দিকে এগিয়ে চলেছেন নিজ নিজ লক্ষ্যে অবিচল  থেকে । জীবনানন্দ রবীন্দ্রনাথের বিপরীতে বইলেন, বিনয় মজুমদার তবুও কিছুটা জীবনানন্দমুখি বয়ে গেলেন, এবং এমন ঘটনাগুলি ঘটতে থাকে, থাকবে । সময় যত এগুবে, প্রকৃত কবি যাঁরা সেই জলধারাগুলি স্পষ্ট থেকে স্পষ্টতর হয়ে উঠবে, বলা বাহুল্য যে, অন্যান্যগুলি ক্রমশ ক্ষীণ থেকে ক্ষীণতর হতে থাকবে । কিন্তু এমনভাবে একটি বিন্দু থেকে উৎসারিত বিভিন্নমুখি জলধারার কথা ভাবলাম কেন ? ভাবলাম, কারণ এমনটি ভেবে নিতে পারলে, বাংলাকবিতার বিভিন্নমুখি স্বরগুলোকে যেমন সহজে চিহ্নিত করা যায়, তেমনই একটি নির্দিষ্ট সময়খণ্ডের মধ্যে যুগপৎভাবে উৎকৃষ্ট ও নিকৃষ্ট মানের কবিতা কিভাবে রচিত হতে পারে, এই দ্বন্দ্বটির একটি সহজ সমাধানে পৌঁছে যাওয়া যায় । জীবনানন্দ বাংলা কবিতার ভাষা, ভাবনা ও পরিধিকে যে জায়গায় নিয়ে গিয়ে রাখলেন, বিনয় মজুমদার, আলোক সরকার, বীতশোক ভট্টাচার্য প্রমুখ যে জায়গায় নিয়ে গিয়ে রাখলেন, তারপরে লিখতে এসেছেন এমন অনেক কবি, এইসব মহৎ কবিদের মাথার ওপর তুলে রাখলেন ঠিকই কিন্তু একইসঙ্গে লেখায়, ভাবনায় ও ভাষায় অতি তরল, অতি সাধারণ থেকে যেতে পারলেন সহজেই এবং এর জন্য কোনো আত্মপীড়াও অনুভব করলেন না, এমন একটি আপাত বিপরীতমুখি বাস্তবকেও মেনে নিতে আর অসুবিধা হয় না তখন । এই পরিপ্রেক্ষিতে আমার মনে হয়, যে কোনো একজন মহৎ কবি আসলে একজন ব্যর্থ কবিও । যে দায়বোধ থেকে তিনি তাঁর সৃষ্টিকে নতুন করে তুলতে চান, অনুসরণীয় করে তুলতে পারেন, সেই দায়বোধ, তাঁর সৃষ্টির মধ্য দিয়ে পরবর্তী প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দিতে পারেন না সহজেই । তাঁর লেখা নয়, তিনি, তাঁর এই দায়বোধ, খুব কম ক্ষেত্রেই অনুসরণীয় হয়ে ওঠে, বা হয়ে ওঠে না বললেই চলে, তিনি একাকী ও নিঃসঙ্গ থেকে যান । তাই বাংলা কবিতা, বা বিশ্বে যে কোনো ভাষার কবিতার বিবর্তনকে একরৈখিক, সদা অগ্রসরমান কোনো সরলরেখা দ্বারা চিহ্নিত করা সম্ভবপর নয় বোধহয় ! 

বাংলা কবিতায় আমার নিজের অবস্থান নিয়ে আমাকে নিজেকেই বলতে বলছ ? শুধু এটুকুই বলতে পারি, তা বলার মতো সময় এখনও তৈরি হয় নি । যে বিন্দুর কথা আমি আগে বললাম, যেখান  থেকে বিভিন্ন জলধারা উৎসারিত, আমি সে বিন্দুর মধ্যেই কোথাও একটা রয়েছি, নিজস্ব একটি পথ খুঁজে পাওয়ার অপেক্ষায় রয়েছি, এটুকুই বলতে পারি ।     



কৌশিক:

খুব সুন্দর বলেছ স্বর্ণেন্দু। আরেকটা কথা বলে আমরা আপাতত শেষ করব। এই যে এত কবি। কেউ কেউ মুখ্য, আর সকলেই ত আমরা গৌণ।আবার এর মধ্যেই কেউ হয়ত ভবিষ্যতের মুখ হয়ে উঠবে। ইতিহাস অন্যদের মনে রাখবে না। সেই গৌণ আমাদের কী অবদান রয়ে যাচ্ছে বাংলা কবিতায়? থাকছে কিছু? কী মনে হয় তোমার?



স্বর্ণেন্দু :

তোমার প্রশ্নের উত্তরে আসছি, তার আগে, একটু ঘুরে আসি । আমি একজনকে চিনি, যিনি এমন এক রাজনৈতিক দলের কর্মী, যে দলের প্রভাব একসময়ে থাকলেও, এখন তা অনেকটাই ম্লান । কিছু প্রাচীনস্বভাবী মানুষ নিজেদের বিশ্বাস ও আদর্শ থেকে এই দলটি এখনও করেন আমাদের এই মফঃস্বল শহর এলাকায়, আমি লক্ষ্য করি, ইনি তাদের মধ্যে অগ্রগণ্য একজন । দারিদ্র রয়েছে, নিজের একমাত্র মেধাবী সন্তানের চিকিৎসার জন্য সর্বস্ব খুইয়েছেন, তারপরেও তিনি নিজের বিশ্বাস ও আদর্শের জায়গায় স্থির । একদিন সকালে দেখি, এই মানুষটি আরও সামান্য কয়েকজনের সঙ্গে, ক্ষমতাসীন সরকারের নানা অপকর্মের বিরোধিতায় একটি স্ট্রিটকর্নারে পরিবেশিত গণসংগীতে গলা মেলাচ্ছেন, যিনি মাত্র আগেরদিন সন্ধ্যায় অষ্টম শ্রেণিতে পাঠরত নিজের একমাত্র সন্তানকে দাহ করে ফিরেছেন শ্মশান থেকে ।

প্রশ্নটি আত্মজৈবনিক, কারণ ‘সকলেই তো আমরা গৌণ’, বা, ‘সেই গৌণ আমাদের কী অবদান—’ এই পর্যবেক্ষণ ও আত্মজিজ্ঞাসায় ‘আমরা’ ও ‘আমাদের’ শব্দদুটি বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ । আজীবন যে কাজটার জন্য আমরা নিজেদের উৎসর্গ করি, বা যে কাজটা নিয়ে থাকি, তার আদৌ কোনো তাৎপর্য থেকে যাচ্ছে কিনা, এমন একটি সংশয়, মনের অবচেতনে হলেও ক্রিয়াশীল থাকে । সন্তান যেমন জন্মদাতার পরিচয়কে বহন করে, এই কাজটির মধ্য দিয়ে আমি থেকে যাব কিনা, কাজটির প্রতি যেভাবে সততা ও আন্তরিকতা থাকে, এই সংশয়টিও সমভাবে ক্রিয়াশীল থাকে । এইটির মতো, যে কোনো আত্মজিজ্ঞাসার আশু সমাধানে পৌঁছে যাওয়া প্রায়শই একটু জটিল, কারণ নিজেকে নিয়ে নিজেকে জড়িয়ে যা-কিছু ভাবনা আমাদের, সেগুলি বেশিরভাগ সময়ই সংশয়ে আচ্ছন্ন ! আর তখনই, আপন হতে বাহির হয়ে বাহিরে দাঁড়ানোর প্রয়োজন হয়ে পড়ে, যদি সামান্যও একটু দিশা পাওয়া যায় !  

এই যে মানুষটির কথা বললাম আমি, তিনিও আসলে একজন গৌণ-মানুষ ! ইতিহাস লেখা হবে, এখনের রাজনীতি আগামীর ইতিহাস-পাঠকের পড়ার বিষয় হবে, তারপরেও এই মানুষটি কোনোদিনও ইতিহাস তো অনেক দূর, ইতিহাসের ফুটনোটেও উল্লেখিত হবেন না । এমন অনেক অসংখ্য গৌণ-মানুষ আবিশ্ব ছড়িয়ে রয়েছে । কিন্তু তা বলে, যে আদর্শ সততা আন্তরিকতা নিয়ে এই মানুষটি আজও বেঁচে থাকেন, নিঃস্বার্থভাবে আজও মানুষের কথা ভাবেন, পাশে দাঁড়ান, নিজের সীমিত ক্ষমতা ও পরিসরে এক-একটি আন্দোলন সংগঠিত করেন,  তার কোনো অবদানই কি থাকবে না ?  এই প্রশ্ন নিজেকে কর, এর একটি উত্তর পাবে, সেখান থেকে আবার নিজের প্রশ্নে ফিরে এস, উত্তরটাকে মিলিয়ে নাও ।

আসলে যে ইতিহাস রচিত হয়, সমাজ-রাজনীতি-সাহিত্য সবক্ষেত্রেই, তা মূলত ‘ঘটনা’-র ইতিহাস, ঘটনাকে কেন্দ্রে রেখে, কখনো ব্যক্তিকে কেন্দ্রে রেখে, অবদানের কথা আসে সেখানে । কিন্তু লিখিত হওয়া উচিত ছিল তো ‘অবদান’-এর ইতিহাস, তাই নয় কি ? অবদানকে কেন্দ্রে রেখে, ব্যক্তি বা ঘটনার কথা উঠে আসবে সেখানে ! এভাবে, অবদানের ইতিহাস লেখা হলে, ইতিহাস রচনার খোলনলচেই বদলে যাবে হয়তো ! তখন তথাকথিত ক্ষমতাশীল, বিখ্যাত, এমন অনেকেই বাদ চলে যাবেন, এবং এইসব গৌণ মানুষজনের অনেকেই সেখানে এসে সহজেই ঢুকে পড়বেন । পদ্ধতি যেখানে একপেশে, একরোখা, সীমাবদ্ধতায় পরিপূর্ণ, সেখান থেকে বড় কিছু আশা করা উচিত নয়, তা নিয়ে ভেবেও সময় নষ্ট করা উচিত নয় ।

কবিতা আমাদের সঙ্গে আছে বলে জীবনটা এখনও একঘেয়ে বিরক্তিকর হয়ে ওঠেনি বরং মূল্যায়িত হতে পেরেছে । এই লেখালিখির কারণে তবুও কিছু বড় মানুষের সংস্পর্শে আসতে পেরেছি, বন্ধু পেয়েছি, বন্ধু হয়েছি, এটাই তো অনেক ।  


কৌশিক:

হ্যাঁ, স্বর্ণেন্দু। একদম তাইই। আমি আরেকটা কথা ভাবি, প্রকৃত অর্থে কবি, তথা সাধক, এক শতাব্দীতে অল্পই জন্মান। মাইকেল, রবীন্দ্রনাথ,  জীবনানন্দ, বিনয় এরকম যারা,  পথ প্রদর্শক। যারা একটা ভিন্ন মার্গ দেখান ভিন্ন ভিন্ন সময় কালে। বাকি রইলাম আমরা, যারা সেই সেতু বন্ধনের কাঠবেড়ালি। অল্প সাধ্য অল্প শক্তি নিয়ে বয়ে চলেছি বাংলা কবিতার ধুলো।  যা কিন্তু কম নয়! আবার বেশিও নয়। কিন্তু বড্ড প্রাণের কাজ। একজন কৃত্তিবাস থেকে একজন মাইকেলের মাঝে রয়ে গেছে অসংখ্য গৌণ কবি।  তারাই ধারক, যারা না থাকলে, ভাষা প্রকৃত অর্থে মৃত্যুর দিকে যায়। খুব ভাল হল তোমার সঙ্গে কথা বলে। অনেক ভালবাসা। ভাল থেকো। 


স্বর্ণেন্দু :

সত্যিই প্রাণের কাজ এটি আমাদের, খুব সুন্দর বললে তুমি । যাইহোক, কথায় কথায় অনেক বিষয় উঠে এল, ভাবলাম সেগুলি নিয়ে, তুমি ভাবনাগুলি উস্কে দিলে, আমারো ভালো লাগল কৌশিকদা । তুমিও ভালো থেক, ভালোবাসা ।



শনিবার, ২৬ জুন, ২০২১

শম্ভু রক্ষিত; এক তারাবীজের কথা

 শম্ভু রক্ষিত; এক তারাবীজের কথা



কৌশিক বাজারী 

---

'আমার মৃত্যুর পর তোকে আর যন্ত্রণার তাঁত বুনতে হবে না

বল দেখি, আমার লেখা গল্পের, আঁকা মানচিত্রের মধ্যে তুই কে?'

 

  কবি শম্ভু রক্ষিত চলেগেলেন তার মহাপৃথিবীর দিকে।  আদতে শিরোনাম রচনাটির একটি সামান্য পরিচিতি মাত্র। খানিকটা আলংকারিক।  তাতে কবি শম্ভু রক্ষিত হয়ত অল্প হেলে বসে থাকবেন।  অথচ তার কবিতাকে বিন্দুমাত্র ছোঁয়া যাবেনা। অনেকে বলেন, অনেক কবিই, শম্ভু রক্ষিতের কবিতা ধরা যায় না ঠিক, বোঝাও যায় না। সত্যি বলতে কি আমিও তা বুঝিনা।  আর ধরতেও চাইনি কখনো  তাকে নিজের মতো করে। কারণ মনে হয়েছে,  এই না-ধরা না-ছোঁয়ার ভেতরেই তিনি রাখতে চেয়েছেন তার ধ্বনিগুলি।      

   কবিতা সম্পর্কে একটি গদ্যে একবার লিখেছিলাম --

   "আমাদের ভাবনার মূলত কোনো ভাষা নেই। ভাবনা মূলত এক অলৌকিক ভিস্যুয়াল।  তার ধ্বনি ও রঙ নিয়ে  সে এক বোবা জগত। বোবা, অথচ মুখরিত।  মূক মানুষের যেমন অগাধ কথা সারাজীবন চাপা থেকে যায়, সে সব কথা কোনোদিন আর তার বলা হয়ে ওঠে না, এও খানিক তেমন।  তবু ভাবনার ভাষাহীন যে ভ্যিসুয়াল তাকে লিপিতে রাখতে গিয়ে বারবার হতাশ হতে হতে তার সবচে কাছাকাছি পৌঁছনোর নামই হয়ত নির্মাণ বা কবিতা।

   এই হতাশা মূলত ভাবনার অবাধ অসীমত্ব আর অন্যদিকে ভাষার অল্পপরিসরের সীমার চিরকালীন  দ্বন্দ। যেখানে ভাবনাকে কেটে ছেঁটে অনন্যোপায় আঁটিয়ে নিতে হবে।"

   এই কথাগুলি এখানে আরেকবার গুঁজে দেওয়া গেল শম্ভু রক্ষিতের কবিতা প্রসঙ্গে। তিনি ভাবনা আর ভাষার সীমানার মাঝামাঝি রেখেছেন তার লেখাগুলি। এখন একজন মানুষ তথা কবির ভাবনা জগৎ কীপ্রকার জটিল আবর্তের খনি তা সেখানে তলিয়ে যাবার আগে বোঝার উপায় নেই।    তা কখনো ধরার বা বোঝার ঘটনা থাকে না আর, যতক্ষণ না সেই ভাবনাগুলি ভাষায় অনুবাদের চেষ্টা করা হচ্ছে। ভাষায় অনুদিত মহৎ কবিতাগুলি  হয়ত বোঝা যেতে পারে।  শম্ভু রক্ষিত কোনোদিন সেই চেষ্টার ধারেপাশে না গিয়ে উল্টোদিকে গেলেন। তিনি তার ভাবনাগুলি ভাষার সীমার প্রান্তে রেখে ছেপে দিলেন। তিনি ভাবনাকে কেটে ছেঁটে ভাষায় আঁটানোর চেষ্টা না করে এক অন্যপ্রকার ভাষা নির্মান করলেন। যা আমাদের পরিচিত ভাষাগণ্ডির বাইরে এক অদ্ভুত    জগত। যা আমরা ধরতে পারি না। বাংলা কবিতায় দেশি বিদেশি ইং ফার্সি হিন্দি মাগধী পালি সহ এমন সব শব্দ বসালেন যা ভাষাভূমিকে বন্ধুর প্রান্তর করে পাঠককে একা ছেড়ে দিলেন। আমার খুব সন্দেহ হয় জানেন! না সন্দেহ নয়,  এ সত্যিই, শম্ভু রক্ষিতের কবিতায় এমন প্রচুর শব্দ আছে যা এই পৃথিবীর নয়।  তবে আমার দৃঢ় বিশ্বাস এই শব্দ অন্য কোনো জগতের,  যার ছাট তিনি বাংলা কবিতায় সৈন্ধব লবনের মতো ছড়িয়ে দিয়েছেন অল্প অল্প।  


ভুক্তি


পথিমধ্যে ছাদ-আঁটা থামওয়ালা চত্বরে বসে ঘোর ও মূর্ছনার মধ্যে পড়লাম।

বিশালাকৃতির হিড়িম্বামন্দির সদম্ভে প্যাগোডার মতো দাঁড়িয়ে র‍য়েছে

আজও অক্ষত দরজা জানলার চৌকাঠে 

হরিণ মোষ ও ভেড়ার শিং এর মাথার খুলি।


মোক্কিকো এসেছে মণ্ডি ও মহাসূতে

আমাকে নিয়ে আরেক লোক পালার সূচনা করবে।

সংসারচাঁদ    দস্তা রূপো পাথর ও পুঁতির মালা পরে উষ্ণ অভিবাদন জানাচ্ছে


মোক্কিকো সুসজ্জিতা, একটু হেসে জমলু প্রধানের প্রশ্নের উত্তর দিচ্ছে জোংগায়:

আমার মাথায় নিশ্চল সূর্য ধরো

    তোমার তো চক্ষু নেই

         আমি শান্তিই ইচ্ছা করি।  

(অংশ) 


এখানে আরো একটি কথা ভাববার, বাংলা কবিতায় যে জোর করে ভাষা বদলের একটা অভিপ্রায় দেখা যায়,  সেখানে তার কৃত্রিমতা দগদগে ঘা এর মতো। অথবা হাস্যকর কোথাও বা। শম্ভু  রক্ষিতের কবিতায় এইসব অদ্ভুত ভাষা তার চিত্রকল্পের মেজাজের সঙ্গে একেবারেই খাপেখাপ এঁটে যায়। হয়ত এই কবিতার স্থান এবং কাল সম্পর্কে কোনো সুনিশ্চিত ধারণায় আমি আসতে পারিনি। এইসকল চরিত্র নাম কোন ভূমি বা কালখণ্ডের তা আমার অগম্য, পণ্ডিতগণ হয়ত বলতে পারবেন। আমি শুধু এক অতিবাস্তবের ভেতর দিয়ে চলে যেতে পারি এই লাইনগুলির মধ্যে দিয়ে। হয়ত অনেকেই তাই।  ভাষা মানে তো শুধু শব্দই নয়, শব্দ আর ধ্বনি দিয়ে এক অন্য চিত্রভাষার দিকে চলে যাওয়া তার কবিতা।


   ব্যক্তি কবি শম্ভু রক্ষিত সম্পর্কে একাধিক  গল্প এবং মিথ থেকে এমনও মনে হয় যে তিনি নিজেও আদৌ এ পৃথিবীর কেউ ছিলেন কিনা! তার অদ্ভুত গল্প গুলিও এ জগতের নয়। কবি সুজিত সরকার লিখছেন--

"তিনি প্রতিবারই আমাদের সঙ্গে কফি খান, অসম্পূর্ণ বাক্যে কথা বলেন, হঠাৎ হঠাৎ খ্যা খ্যা শব্দে হেসে ওঠেন, প্রতিবারই কফি হাউস থেকে বেরিয়ে গল্প করতে করতে কিছুদূর হেঁটে আসেন, তারপর প্রতিবারই হাওয়ায় মিলিয়ে যান। তিনি কোথায় থাকেন তা আজও আমরা কেউই জানি না। তিনি লিখেন 'আমি পৃথিবীর কত বাইরে, কত উপরে আছি'।"


  তাহলে দেখা যাচ্ছে তার কাছাকাছি থাকলেও তিনি সেই নিকটত্ব স্বীকার করতেন না। কারণ তিনিই প্রকৃত তারাবীজ কবিদের শেষ প্রতিভূ। তারাবীজ। তিনি নিজেই ঠারেঠোরে,  কখনো বা প্রকাশ্যেই কবিতার কোনো পংক্তিতে স্বীকার করে নিয়েছেন বিষয়টি। তিনি তারাবীজ। স্টার সিড। অন্যকোনো নক্ষত্রমণ্ডলীর অন্যকোনো গ্রহের থেকে ছিটকে আসা প্রাণ। মূলত ছদ্মবেশী।     


আমার লেখার সপক্ষে প্রমাণ


 'সাসানীয়'


পৃথিবী দগ্ধমাটির গর্ভে উড়ে এল যখন, তখন আলো

সৃষ্টি হবার আগে তার জ্যোতি আমাকে আত্মা দিয়ে গিয়েছিল।


পৃথিবী তখন মূলছাড়া, সরলরেখায় টানা, তখন আমার পা নেই

হালকা অবিক্লিব স্বর্ণবর্ণ ঘোড়ায় চড়ে সূর্যকে দক্ষিণ দিকে

দেখতে দেখতে তাই আমি এই সোনার ঢালুস্থানে হাত মেলেছিলাম।

(অংশ)   

 

এই কবিতার বইটির নাম 'আমি কেরর না অসুর'।  এই 'কেরর' মানে কী, আমি জানিনা। এটা সম্ভবত সেই জাতীয় শব্দ। ভিনগ্রহী।  


তিনি যে ছদ্মবেশী, তা আমি নিজের চোখে দেখেছি। এই পৃথিবীতে প্রচুর মানুষ রয়েছে। সবার সঙ্গে সবার দেখা হবে না, নিয়ম নেই। কিছু মানুষের সঙ্গে কিছু মানুষের দেখা হওয়া নিয়ম। যে নিয়মে বিবাহ, বন্ধুত্ব, প্রেম ও শত্রুতা হয়। অল্প চেনাও হয় কেউ কেউ। অল্প চেনা হিসেবে শম্ভুদার সঙ্গে সেবার দেখা হল।  

   আমি আর সুকুমার, এলোমেলো ঘুরছি লিটিলম্যাগাজিন তাঁবুতে। কবি শম্ভু রক্ষিত একটা চেয়ারে এক পা তুলে বসে হেলান দিয়ে তামুক লাগাচ্ছেন দাঁতে। আমরা মহাপৃথিবী ওল্টাচ্ছি। প্রত্যেক সংখ্যাতেই শেষ পৃষ্ঠায় শম্ভুদার কবিতা। এক পাতা জোড়া। আশ্চর্য,  তার এক লাইন কমও নয়, বেশিও নয়! আমি বল্লাম,  শম্ভুদা, এরকম কীকরে হয়? প্রতিটা কবিতা পুরো এক পাতাই! শম্ভুদা ঘাড় ঘুরিয়ে, তামুক ফেলে, গায়ের চাদর ঠিক করে, ডান পা নামিয়ে বাঁ পা তুলে বল্লেন -- হয় না। লিখি ত অনেকটাই, ওই এক পাতায় যতখানি ধরে, ছেপে দিই। কম পড়লে দু-চার লাইন লিখেও দিই।  বলে গম্ভীর হয়ে রইলেন। আমি আর সুকুমার, তখনো তত ইস্মার্ট নই, অন্তত শম্ভুদার এসব মজাকি বোঝার মতো, হাঁ হয়ে রইলাম খানিক...


  দ্বিতীয় গল্পটা সুকুমারের সঙ্গে ফোন নং আদান প্রদানের। তখনো মহাপৃথিবীর টেবিলে দাঁড়িয়ে। এটা সেটা গল্প। সুকুমার আমার চে ইস্মার্ট ,  আলাপ করিয়ে দিল। এ কৌশিক, একটা পত্রিকা করে। 'মিরুজিন' দিলাম। তিনি হাতে ধরে বল্লেন - এ তো অনেক খরচা। গলার স্বর নিস্পৃহ। 'তুমি ত বড়লোক!' সুকুমার বলল না না ও বেকার। উনি আমার দিকে অপাঙ্গে চেয়ে বল্লেন ধপধপে জামা-কাপড়, ফোন আছে তোমার?, আমি হ্যাঁ বল্লাম। উনি হাসলেন, অর্থাৎ তাহলে আর অভাব কিসের। আমি সংকোচে চুপ করে রইলাম পরিস্কার পোশাক আর পকেটে ফোন থাকার লজ্জায়। উনি দাঁতে তামাকু ঘসতে ঘসতে উদাসীন হতে হতে পত্রিকাটি একপাশে নামিয়ে রাখলেন।     

  তো এই সময় সুকুমার শম্ভুদার কাছে ফোন নং চাইলেন। তারপরের ঘটনাটা সুকুমারের জবানীতে দেখা যাক। গতকালই ও লিখেছে এটা--

     "হ্যাঁ, এমন একটা সময় ছিল, কৌশিক না গেলে আমি বইমেলা যাবার কথা ভাবতামই না, এবং কৌশিকও সম্ভবত তাই। তো শম্ভুদাকে নিয়ে কৌশিকের গল্পটির পর আমার সঙ্গে তাঁর দ্বিতীয় গল্পটি এইমতো ( আরও আছে কিন্তু)---

পাখিরার জন্যে শম্ভুদার লেখা নেব। সব সময় তো আর দেখা হয় না আমাদের। একদিন বইমেলায় শম্ভুদাকে বললুম, ফোন নাম্বার দিন, একটা ফোন নাম্বার থাকলে খুব সুবিধে হয়। শম্ভুদা 'লেখ্' বলতেই কাগজ-কলম নিয়ে আমি রেডি। চটপট করে বলে গেলেন। গুনে দেখি, ১০ টা ডিজিটই আছে। তবু বললুম, শম্ভুদা, আরেকবার বলুন, আমি একবার মিলিয়ে নিই। 'তুই বল, আমি মেলাই'। ডিজিটগুলো পড়ে শোনাতেই বলেন,'ঠিক আছে'। তারপর কবিতার জন্য তাগাদা দিতে গিয়ে দেখি, ওই ফোন একজন মহিলা ধরেছেন। খুব ভদ্রস্বরে বলি, শম্ভুদা আছেন, ওনাকে একটু দেবেন? মহিলা বলেন, এখানে সেরকম কেউ থাকে না। ন্যূনতম আশা এবং অনেকখানি আশঙ্কা নিয়ে আরও কয়েকবার ডায়াল করেছিলাম ওই নাম্বারে। কিন্তু সেই একই কণ্ঠস্বর, শেষমেশ তার চরম গালাগালি খেয়ে ক্ষান্ত হই। পরের বছর বইমেলায়, মহাপৃথিবীর টেবিলে গোটা ঘটনাটি শম্ভুদা আমার মুখ থেকে খুব আগ্রহ নিয়ে শোনেন এবং অবশেষে মুচকি হেসে বলেন, তুই একটা নাম্বার চাইলি, আমিও দিয়ে দিলুম।

প্রণাম শম্ভুদা! দণ্ডবৎ!"


   এইসব গল্পের ভেতর কবি শম্ভু রক্ষিত চলে যেতে যেতে একেকটা মিথের ভেতর একেকরকম ভাবে জ্বলে উঠবেন। ডান পা নামিয়ে বাঁ পা তুলে বসবেন, তামুক মুছে নেবেন চাদরে, সুদূর মহাপৃথিবী ভেদ করা উদাস তাকিয়ে অগ্রাহ্য করবেন হালচাল, আর জীবনকে একটা ক্যালাইডোস্কোপের ভেতরে না দেখে তিনি জগতকে ক্যালাইডোস্কোপের ভেতর বসিয়ে ফুটোতে চোখ রাখবেন। ফলে তার কবিতা নানা ডিজাইনের জগতটুকরের   আলপনার মতো দেখাবে। যা পড়লে বোঝা যায় রঙ রেখা শব্দ আলো মুহূর্তে তার অবস্থান বদল করছে। জগত আনচান করছে। আর এত বড় জগৎ, যা পৃথিবীর মানুষের অগম্য, ভাষার অগম্য, তা আমরা বুঝতে পারবনা। আমাদের তৈরি ঝকঝকে কৃত্রিম জগতের প্রেক্ষিতে তার ওই এক পা চেয়ারে তুলে বসে থাকা, তামুক লাগানো,  আর আমাদের সাজানো সমস্ত কিছুকে অস্বীকার আর কিছুই নয়, একজন তারাবীজের জীবন ব্যাতীত।   


"ক্রমশঃ সেই সব মুহূর্ত, ধনুক আর তুণ, রামধনুর মত শেষ তুষারান্তর

সৌরপৃষ্ঠের বর্ণছত্র যেন অতিক্রম করে গহ্বর অতল, তোমার অধুনালুপ্ত স্পর্শ 

অরণ্যের মত পড়ে থাকে রূপান্তর প্রশান্তির গভীরে, অন্তর্নিহিত হয়ে বিশ্লেষিত    

উদ্ভাবনার ঊর্ধ্বে,  অন্ত্য অনাবৃষ্টির যুগে এই তন্ময়তা, জীর্ণপাতা পরীক্ষা,

কৌতুহল চরিতার্থ করে যাও। বেশী সুযোগ, একটি সংবাদ: পৌরাণিকদেবী

আফ্রোদিতে হাথোর-মিউজ ব বেনখাজির ভেনাসের চেয়েও সুন্দর স্বর্গীয়

উজ্জ্বল রূপ তোমার, পাথরে বেলুন,  আঃ এই উন্নীত আলোড়ন অপার্থিব

জগতের মত পরিশুদ্ধ ও আরো পবিত্র নতুন; আশ্চর্য মনঃসংযোগ, ঘৃতাচির

অভিজ্ঞতা ফুরিয়ে যাবার শেষ এই ধর্মীয়-বেদন,  উদবর্তনের  সম্ভবনা;

ঈশ্বরের কাছে রক্ষিত তার অস্তিত্বের রূপ বা তাঁর প্রতিমার   "                  


   কারন,   এইসব যখন লিখছি, সেই কবির দেহাবসানের পর তার এ জন্মের গ্রামে, এবারের এই গ্রহের এক অখ্যাত প্রত্যন্ত গ্রামে তার অন্তিম যাত্রার ছবি স্যোসালমিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়ছে। এই গ্রহের নিয়ম অনুযায়ী এক কবিতাখ্যাত ব্যক্তির যা হয়, অথবা অভিজাত শিল্পীর অথবা দেশ চালনার  সঙ্গে যুক্ত মানুষের বিদায় দৃশ্যের সঙ্গে অথবা সাধারণ মধ্যবিত্ত গেরস্থের সঙ্গেও যার কোনো মিল নেই। গ্রামের অতিসাধারণ ঝোপঝাড়পূর্ণ একটা মেঠো পথ, বাঁশের মাচায় খেজুর পাতার চাটাইয়ে  মোড়া তার দেহ, আর চারজন শব্বাহকের পিছনে আদিগন্ত এ গ্রহের এবড়োখেবড়ো মাঠ, বেঁটে গাছ,  সামনে একটা পুকুর, তার সবুজ জলে  চারজন স্থির শববাহকের ছায়া পড়েছিল।  কাঁধে তিনি।


"আমি রক্তমাখা হাসি ও সূক্ষ্মতা নিয়ে অস্পষ্ট চীৎকার করে

আবার একাকী পথে ফিরে যাব

এবং আমি ঘৃণাভালবাসাপ্রেম সুন্দরের জন্য,

    যুদ্ধঅভাবের   জন্য দীর্ঘ-সবুজ হব

আহত উদ্ধত প্রিয়-পরীদের অগণিত মুখ, মুখের মিছিল  নিয়ে  ফিরে যাব আমি।"


তিনি লিখে রেখেছিলেন। তাঁকে প্রণাম।

...




      


শুক্রবার, ২৫ জুন, ২০২১

দেশ-রাষ্ট্র সংবাদ


ছবিঃ মিঠু সেন

দেশ-রাষ্ট্র সংবাদ 


.

১.

অসীম সীমানা

ছোটবেলায় শুনতাম বাবা তার দেশের বাড়ি যাবে। দেশের বাড়ি মানে কি? মানে, বাবা যেখানে জন্মেছে, তার ছোটোবেলা কেটেছে, সেই গ্রাম। গ্রামের নাম মেঠানা। সেই মেঠানা হল বাবার দেশের বাড়ি। সেখানে বাবার কাকাতো ভায়েরা আছে,কাকা আছে, খুড়িমা আছে। জমি জমা আমবাগান, বাঁশবন আছে। আমি বাবার সাইকেলে চেপে যেতাম বাবার দেশের বাড়ি। বাবা বলতো দেশগাঁ। মেঠানা হল বাবার দেশ। বাবার সাইকেলে চড়ে লালমাটির মেঠো পথ ধরে আমি বাবার দেশ গাঁয়ে যাই। বাবার দেশ তো আমারো দেশের বাড়ি! ঘন শালবন আর মহুয়ারবন পেরিয়ে যাই। বাবা চিনিয়ে দেয় দূরে দুরে কোনটা কোন গ্রাম। পথে হয়ত বাবার চেনাজানা কোনো লোকের সাথে দেখা হয়ে গেল। একটা বিশাল মোলগাছের ছায়ায় দাঁড়িয়ে তারা কথা বলে, বিড়ি খায়, তারপর আবার চলতে থাকি কংসাবতীর অগভীর ক্যানেল পেরিয়ে ঘনবনের ভিতর দিয়ে।

আমার দেশ কোথায়? এই, যেখানে আমি জন্মেছি, এই বিষ্ণুপুর, তার মাটি, আশপাশ, গলিঘুঁজি, পথঘাট, লাল ছড়ানো মাটি আর তার ইতিহাস, গল্পকথা। কোথায় কখন আমাদের এই পাড়ার ভেতর বাঘ বেরিয়ে ছিল একদিন। পিন্টুদের পুকুরপাড়ে ঝোপের ভিতরে একদিন সকালে সেই বাঘ দেখে কে ভয় পেয়ে গিয়েছিল, তারপর সেই বাঘের সাথে আমাদের পাড়ার লোক সুরেশ গরাই এর সেকি মরণপণ লড়াই, হয়ত এইসব ষাট-সত্তর বছর আগের গল্পকথা, শুনতে শুনতে নিজের জীবনের অংশ বলে মনে হয় এখন। একটা দেশ মনের ভেতর রচিত হয়ে যায় অতি ধীরে। বাবা মায়ের মুখে মুখে শোনা এইরকম আরো কত গল্পের ভিতর দিয়ে, কত অভাব অনটন দুঃখ ও সুখস্মৃতির ভেতর আমাদের বড় হয়ে ওঠা—এই সমস্ত বিষয়টাই কি আমার দেশ নয়? এর বাইরে কোথায় কতদূর আমার রাষ্ট্রীয় মানচিত্র ছড়িয়ে রয়েছে আমি জানিনা। আমি তাজমহল দেখিনি, লালকিলা দেখিনি, দিল্লী যাইনি কখনো। সংসদ ভবন দেখিনি দূর থেকেও। তবু কাগজের মানচিত্র যদিও আমার পৌত্তলিক ঠাকুর বলে আমি মেনে নিই, তথাপি হৃদয়ের ঠাকুর কিন্তু এই আমার জন্মভিটের দিকে দিকে ছড়ানো বিস্তার আর এই মাটিতে জন্মানো মানুষগুলি আর দূর বহুদূর তাদের অগণিত দেশগাঁ। যেখানে জন্ম ও জীবন প্রবাহিত হয়। সেই আমার দেশ।

    

   একটি বিস্তীর্ণ ভূভাগের মানুষের কৃষ্টি। তাদের ভাষা, সংস্কার, জলবায়ু আর পরিবেশের উপর গড়ে ওঠা খাদ্যাভাস। গান, কথকতা, আর জীবনেতিহাস। শুধুমাত্র কোনো রাজকাহিনী নয়, যুদ্ধের ইতিবৃত্ত তাও নয়, বরং তার জীবনধারণের সামগ্রিক ইতিহাস একটা জাতীকে নির্মান করে দেয়। আমার বাংলাভাষার মাটি কতদূর অবদি ছড়ানো? বাঁকুড়া, পুরুলিয়া, নদীয়া , কোচবিহার, দিনাজপুর, বগুড়া, রাজশাহী, বরিশাল,  শিলচর, কাছাড়, আগরতলা... কত কতদূর পর্যন্ত চলে যেতে পারি হাতে হাত রেখে? এ হল দেশ! বহুদূর পর্যন্ত কোনো বাধা নেই,বৃষ্টিপাত, মেঘ ও বাতাসে, কবিতায়, কাব্যে গানে ও মৎসাহারে। যদিও মধ্যিখানে রয়েছে রাষ্ট্রীয় বাধার প্রাচীর। তার বয়স খুব বেশী নয় যদিও। সেই একই দেশ একই মানুষ, পরিবর্তনহীন। রাষ্ট্রসীমা শুধু পাল্টে যায়।  ভাল বা মন্দের চেয়েও—এ হল ঘটমানতা। 

   যে হাজার হাজার মানুষ সীমা পারাপার করেছিল এই বাংলায়, মাত্র কয়েক দশক আগে, তারা  জানে দেশ কী! আর রাষ্ট্র কী! আমরা জানি না। আমাদের কখনো রাষ্ট্রের জন্য দেশ ত্যাগ করতে হয়নি। পথে মা ভাই বোন হাত পা ও মুণ্ডু হারিয়ে ফেলতে হয়নি। অজানা অচেনা ‘দেশে’ পথে পথে ভিক্ষে করতে করতে মরে যেতেও হয়নি। যেমন এখন এই মূহুর্তে হাজার হাজার মানুষ দেশ ত্যাগ করে চলেছে সিরিয়া, লেবাননে...। সে অনেক দূর দেশ,  আর্ন্তজাতিক ঘটনা এসব, আমরা কেবল টিভিতে দেখি সমুদ্র তীরে মুখ গুঁজে পড়ে আছে কাদের এক শিশু।

 সেই কারণেই দেশের দিকে মুখ ফেরানো যাক। বরং ঘরের দিকে মুখ ফেরাই--


কতদিন হয়ে গেল শীতল আসেনি। শীতল আমার বন্ধু। কবি। শীতল বিশ্বাস। শীতলের মামা বাড়ি বাংলাদেশের কোনো এক গ্রামে। শীতলের সারা জীবনে কখনো মামা বাড়ি যাওয়া হয়নি। শীতলের মা যখন আমাদের সাথে কথা বলে তার কথার মধ্যে ‘স-স’ উচ্চারণ বেশী শোনা যায়। যেন বাংলা দেশের কোনো নদীর পাড় ভাঙার শব্দ। তাঁর আর দেশে ফেরা হয়নি কখনো, এ জীবনে আর দেশে ফেরা হবে না একবারো। শীতলের একটা কবিতা দিয়ে লেখাটা শেষ করব, না, এ কবিতা কোনো রাজনৈতিক কবিতা নয়—


ফুলপুর

--------

কে যেন কবে বলেছিল ফুলপুর তার মামারবাড়ি

সেই থেকে মনে মনে তাকে খুঁজি

আর জিজ্ঞাসা করি--

ফুলপুরে তোমার, তোমার মামারবাড়ি ?

দু'একজন বলেছে নামটা শোনা বটে

রাঢ়দেশে নয়, বঙ্গদেশের কোথাও হবে

তবে কোথায় বলতে লারবে।

আজও আমি ফুলপুরের ভাবনা ভাবি

ফুলপুরের স্বপ্ন দেখি।

যদি সত্যি হ'য়ে যায়--

সত্যি

কোনোদিন কারুর সাথে আমি ফুলপুর বেড়াতে যাচ্ছি...



২.

চাষা ও ভুতের গপ্প


  বাবার জ্যাঠা একবার মরণের হাত থেকুন বেঁচে ফিরেছিল।

   ভিটাবাড়ির পিছনে ঘন বাঁশ আর আম কাঁঠালের বন ছিল আমাদের। সন্ধ্যা থেকেই শেয়ালের ডাকে ভুতুড়ে হয়ে থাকে অন্ধকার গ্রাম। ভুত প্রেত আরো ইতর আত্মা জীবিত ও মৃত সব মানুষের সঙ্গেই পাশাপাশি থাকতো সেইসব গ্রামে। ইংলণ্ডে মহারানী আর দিল্লীতে বড়লাটের চেহারা কেমন কোনো খোঁজ ছিল না তাদের। না ভুত, না মানুষের। খুব ভোরে, ঝুঁঝকা  অন্ধকার থাকতে কাম-কাজ শুরু হয়ে যাওয়া গ্রাম সব। সেচের কাজ খুব ভোর থেকেই শুরু হয়ে যায়।  সদর দরজার পাশে মাটির পাঁচিলে ঝোলানো সেঁউতি খুলে দুজন মানুষ কাঁধে বয়ে নিয়ে যেত এক ক্রোশ পথ। হাতে কেরোসিনের লণ্ঠন অল্প কালো শিস উড়িয়ে জ্বলতে থাকে বাঁ'হাতে। বাবার রামুকাকা রোজ ভোর রাতে ডেকে তুলত জ্যাঠাকে। তারপর নিঃশ্বব্দে কাজ শুরু হত। অত ভোরে অন্ধকারের চুপের ভেতর কারো কোনো কথা থাকে না স্বভাবতই। সেদিনও ছিল না। শীতের ভোরে উঠে পড়েছিল জ্যাঠা রামুকাকার ডাকে। লণ্ঠন কোনো অজানা বাতাসে নিভে গিয়ে থাকবে। জোনাকি আর একফালি কুয়াশা ঢাকা চাঁদ ছাড়া কোনো শব্দ ছিল না।  দূরে দূরে ক্ষেতের আলের উপর অন্য সব লণ্ঠনের আলোগুলিও ছিল না সেদিন। রামুকাকা সেঁউতির একপ্রান্ত পায়ে চেপে জলে ডোবায়, অন্যপ্রান্ত জ্যাঠা দড়ি ধরে নামায়, জল একটা সরু নালার ভেতর দিয়ে জমিতে বয়ে যায় এক নাগাড়ে। রামুকাকা ভুতে পাওয়ার মতো কাজ করে চলে।  অন্ধকারে তার মুখ দেখা যায় না। ঘন্টা প্রহর গড়িয়ে যায় নালা বেয়ে, পূবের আকাশ ফর্সা হয় না। চাঁদ ডুবে গেলে আরো ঘন অন্ধকার হয়ে আসে চারপাশ। হতক্লান্ত জ্যাঠা ক্ষেতের আলের উপর গড়িয়ে পড়িয়ে পড়েছিল।  অচৈতন্য,  শ্বাস পড়ছিল মৃদু। 

   মুখে জলের ঝাপটে তার যখন জ্ঞান ফেরে তখন মুখের উপরে ঝুকে পড়েছিল রামুকাকা আর সাবির আলীর মুখ। পূবাকাশ নীল হয়েছিল তখন। রামুকাকা বিস্মিত আর রাগত স্বরে বলেছিল -- আজ একা এলি কেনে! অত রাত থাকতে কুন নিশিতে পেইছিল তকে! বারআইলি একাই? 

বাবার জ্যাঠা সেবার মরণের হাত থেকুন বেঁচে ফিরিছিল। 

ভুত প্রেত মানুষ আর নিশির সঙ্গে বাস করা গ্রামগুলি নাই। ধ্বংস হয়ে গেছে। এখন ইংল্যান্ডে মহারানী আর দিল্লীতে যারা আছে, তাদের চেহারা তারা জানে। ভুত প্রেত নিশি মানুষ আরো ইতর আত্মা মনুষ্যেতরদের সঙ্গে নিস্পৃহ বাস করা চাষাগুলি আছে। তাদের চেহারাগুলিও জানিয়ে রাখা দরকার বলে তারা আরো একবার নিশির ডাকে খুব ভোরে বেরিয়ে পড়েছে। অচৈতন্য হতে হতে উঠে দাঁড়াচ্ছে। তাদের মরণ নাই। ধ্বংস নাই। তাদের মুখের উপর ঝুঁকে পড়ছে একটা  আস্ত দেশ...।

বৃহস্পতিবার, ২৪ জুন, ২০২১

বিকাশ জেঠুর কথা

 

বিকাশ জেঠুর কথা

*


   অগ্রজ কবিদের দাদা বলার প্রথাটি ( তিনি বয়সে পিতার অগ্রজ হলেও) তখন যে জানা ছিল না, শুধু তাই না, তিনি ছিলেন নিতান্তই পাড়ার মানুষ। বাবা তাঁকে সাতুদা ডাকতো। আমরা সাতু জেঠু বলতাম কেউ কেউ, তবুও শেষ পর্যন্ত তিনি আমাদের সকলের বিকাশ জেঠু হয়ে উঠেছিলেন একেবারেই সেই আদি শহরের ঘরোয়া সম্পর্কের কারনেই। সকলের,  অর্থাৎ শুধু বিষ্ণুপুর নয়, আমার তাবৎ বন্ধুকুল, যতদূর তাঁর কবিতা পৌঁছেছে, যতদূর তাঁর গল্পকথাগুলি মুখে মুখে পৌঁছেছে।  এবং ততদূর, তিনি কবি বিকাশ দাশ।


 বিকাশ জেঠু ঠিক কবির মতো দেখতে ছিলেন না। (এইখানে ধরে নিতে হবে কবি কেমন দেখতে হয় তা সকলেই জানেন)। বরং ভারতীয় সনাতন সাধুমুর্তিটি যেমন হয়, অনেকটা তার সঙ্গে মিলে যেতো জেঠুর তাকিয়ে থাকা। গেরুয়া কাটা লুঙ্গি, গেরুয়া হাফ পাঞ্জাবী, কাঁধে হলুদ ঝোলা, পায়ে চটি। সাদা দাড়ি হাওয়ায় ওড়া, এই ছিল আপামর বিষ্ণুপুরবাসীর কাছে সেই পরিচিত চেহারা। পরিচিত, কিন্তু রহস্যময় চরিত্র! 

  রহস্যময়, কারন, পাথরদরজা-দূর্গের উল্টোদিকে  মুর্ছার পাড়ের উপর সন্ধেবেলা ঝোপের আড়ালে বসে থাকেন কেন একা? শ্মশানকালী মন্দিরের চাতালে আশ্রয় নেওয়া এক পাগল আর এক পাগলী, যারা ভাই বোন, তাদের অমন ধমক দিলেন কেন সেদিন রাস্তায়?  শাঁখারিবাজারের সেই শয্যাশায়ী বৃদ্ধা  মহিলাটির বাড়ি মাসে একবার গিয়ে দেখা করবেন তিনি, এও জানা হয়ে গিয়েছিল আমার। এক শীতের সন্ধ্যায় চাফির কাপ হাতে ধরিয়ে মূহ্যমান বসে পড়লেন তিনি। আমি চাফিতে চুমুক দেওয়ার আগেই তিনি দীর্ঘশ্বাস সহযোগে (জনান্তিকে, অথবা আমাকেই) বললেন --' বোনটি চলে গেল, ভাইটি এখন একা পড়ে রইল।' আমি জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে চাইতে তিনি যোগ করলেন--'সেই পাগল ভাইবোন দুটির একজন,গতকাল চলে গেল। ওহ! কি শূন্য দৃষ্টি ভাইটির, আজ সকালে দেখা হল, সেই বটগাছের নিচের চাতালে বসে আছে একই জায়গায়, একা'। জেঠুর চোখে চেয়ে বোঝার চেষ্টা করলাম পাগলের চোখের শূন্যতার উপর নেমে আসা শোক ও আরো শূন্যতা কতদূর হয়!

    অকৃতদার বিকাশ জেঠুর এইসব আপজনদের কথা আমরা বন্ধুরা কেউ কেউ জানতাম। একজন পরিচিত মানুষের বাড়ির লোকের কথা, তার ঘনিষ্ঠজনদের কথা বিনা প্রচেষ্টায় যেমন আমরা জেনে ফেলি ধীরে ধীরে, সেই ভাবে। 

    

    একেকদিন খুব সকালবেলা তিনি চলে আসতেন।  হয়ত সেইমাত্র মুখ ধুয়ে আমার টঙের ঘরে এসে বসেছি। নিচ থেকে সেই সুরেলা কণ্ঠ-- কৌশিইইক...। ভোরবেলা বেরিয়ে পড়তেন সূর্যোদয় দেখতে একেকদিন একেক দিকে। একদিন এসে বল্লেন চলো, আজ দ্বারকেশ্বরের দিকে যাই। তোমার নতুন স্কুটিতে চড়া হয়নি এখনো, আজ ঘুরে আসি তবে।   

     দ্বারকেশ্বরের তীরে বসে আছি। সামনে আদিগন্ত চিকচিক করছে বালি। বহুদূরে নীল সরু সুতোর মতো নদীরেখা, বালিতে উলটানো ভাঙা নৌকা অর্ধেক গেঁথে আছে।  হাওয়া বয়ছে। জেঠু সেই শূন্যের ধু-ধুর দিকে চেয়ে।

--কৌশিক, একাশি হল।

আমি চমকে ফিরে তাকাই।

--হ্যাঁ ভাই, এই ত, এবারের মতো হয়েই এলো দিনশেষ…

হাওয়ায় জেঠুর সাদা দাড়ি উড়ছে। দূরে আঁচবাড়ি গ্রামের থেকে একটা হালকা ধোঁয়ার কুন্ডলী আকাশে উড়ছে ওইপারে।

   শাঁখারিবাজারের ঘিঞ্জি গলিপথ দিয়ে ফিরে আসার সময়, জেঠু হঠাৎ বললেন, ভাই তোমার গাড়ির চালটি বড় সুন্দর!  আচ্ছা ভাই একটু দাঁড়াও এইখানে।  মদনমোহন মন্দিরের কিছুদূরে, রাস্তার ধারেই একটা নিচু চালার ঘর। ভাঙা টিনের ছাউনি নেমে এসেছে বুক অব্দি। নিচু হয়ে দাওয়া পেরিয়ে অন্ধকার ঘরের ভেতর কাউকে ডাকলেন একবার। এক বৃদ্ধা, কোমর নুয়ে পড়া ভার নিয়ে একঝলক দেখা গেল। দুমিনিটও হয়নি, জেঠু ফিরে এলেন। 

--চলো ভাই...এক্টু থেমে খুব কুন্ঠিত ভাবে… এখানে মাসে একবার আসতে হয়, জানোই তো, ভদ্রমহিলার কেউ আর বেঁচে নেই, ভিক্ষা করতেও পারেন না আর...তিনি চুপ করলেন। আমি স্কুটির ইঞ্জিন চালু করলাম।

    রাস্তার উদাসীন পথিক, পাগল, ভিখারি হয়ে যাওয়া একদা নিম্নবিত্ত, মুমূর্ষু, যারা হারিয়ে যায় সমাজ সংসার থেকে,  যারা আলাদা হয়ে যায় এই আত্মসুখের সাজানো সংসার থেকে, তারা কারো চোখের দিকেই চায় না আর। মানুষের সমাজ থেকেও তারা অদৃশ্য হয়ে যায়। আমরা আর তাদের দেখতে পাই না। এইসব মানুষদের হৎাৎ দেখা যেত বিকাশ জেঠুর কাছাকাছি দৃশ্যমান হয়ে উঠতে। 



  তথাপি, কবি বিকাশ দাশকে বিকাশ জেঠুর গল্পগুলি দিয়েই কিছুটা ধরে রাখার চেষ্টা এই মুখবন্ধ।

    যখন কলেজে পড়ি, তার কিছু আগেপরে চাকুরি থেকে অবসর নিয়ে তিনি চলে এসেছিলেন তার পুরনো বিষ্ণুপুরের বাড়িতে। বিশাল ছড়ানো দেয়ানবাটির এক মাটির বাড়ির দোতলার একটি ঘর সাজিয়ে নিয়েছিলেন নিজের জন্য। সেখানে প্রথম কবে গেলাম? সুদেবদার(বকসী) সঙ্গেই কি? সেই ঘরেই ত শুনেছিলাম সুদেবদার সেই কবিতাটি--'বিকাশ জেঠু, ফিরে আসব, আবার তোমার গল্পে দেব চঞ্চুসঞ্চালন'। 

   যেখানে কোনো কোনো সন্ধ্যায় আমরা কয়েজন বন্ধু জেঠুর হাতে চাফি খেতে যেতাম। আসবাব বলতে একটা বড় বুকসেল্ফ, একটা ছোট বই ভর্তি টেবিল। একটা লুঙ্গি, জামা রাখার আলনা।  ব্যস। শয়ন মাটিতে কম্বল পেতে। একবার বর্ষায় কম্বলের ভেতর কাঁকড়া বিছে ঢুকে পড়েছিল বলে একটা তিন বাই ছয়ের প্লাইউড কিনে আনলেন, তার উপর কম্বল পেতে মশারির ধার গুঁজে দিতেন প্লাইউডের নিচে।   আর ছিল একটি দড়ি বাঁধা রেকর্ড প্লেয়ার, বিভিন্ন ভারতীয় ঘরানার রাগ সংগীতের সংগ্রহ, আর বহু পুরনো দিনের,  সাদাকালো জমানার একটি ক্যামেরা। ছবি তুলতে ভালবাসতেন শুধু নয়, রীতিমতো ভাল ফটোগ্রাফার ছিলেন একজন। 

এহেন বিকাশ জেঠুর খাদ্যাভাস ছিল আশ্চর্য রকম! দুপুরে একমুঠো সাদা ভাত আর একবাটি টকদই, অল্প সবুজ তরকারি হয়ত,  আজীবন এই।      

   একজন কবির কথা লিখতে গিয়ে এসব কি খুব জরুরি তথ্য? না,  হয়ত নয়, আবার মনে হয় এসব না লিখলে তার  ছবিটি   অসম্পূর্ণ রয়ে যাবে। আজীবন রবীন্দ্রনাথ আর বিভূতিভূষণএ নিবেদিত একজন মানুষ শুধু বইএর পাতায় নয়, লেখায় নয়, জীবনেও কতখানি নিবেদিত তা ধরা যাবে না হয়ত।    


   মাইথনের ডি ভি সি ব্রাঞ্চে কর্মজীবনের কথা তার মুখেই শুনেছি বহুবার। ডায়েরি খুলে সেইদিনগুলিতে পৌঁছে যেতে ভালবাসতেন। পড়ে শোনাতেন প্রতি বছর গ্রীষ্মের ছুটির দিনগুলিতে হিমালয় চলে যাবার কথা। সারাজীবনে মাত্র চৌঁত্রিশবার হিমালয়ে গেছেন, অল্প হেসে বলতেন সে কথা। সেই বাটারফ্লাই ভ্যালির নিদারুন স্তব্ধতার ভেতর একা বসে থাকার কথা,  অন্য এক অভিযাত্রী দলের নেত্রীর সঙ্গে হঠাত আলাপের কথা, যুবা বয়সে তার সঙ্গে পত্র আদান প্রদানের কথা বলতে গিয়ে মুখ অল্প লালাভ হয়ে উঠত কি জেঠুর? অল্প চুপ থেকে অন্য এক হলুদ হয়ে যাওয়া ডায়েরির পাতা খুলে ততধিক হলুদ এক চিঠি বার করে পড়তে শুরু করলেন। আর হয়ত বছর পঞ্চাশ আগের বাটারফ্লাই ভ্যালির অর্কিডের ফুল,তার রঙ,  হিমেল বাতাসে পলল পাথরের গন্ধ,  হিমালয়ের পথের সব্ধ্যার অস্তরাগ এসে পড়ল তাঁর ছোট্ট কোঠাঘরের মধ্যে! আমি,  হয়ত একা, সামনে বসে আছি পুত্র তুল্য, তবু তিনি বন্ধুর মতোই সলজ্জ হয়ে উঠছেন কখনো কখনো!  তারপর পাঠ করছেন পুরনো কবিতা। কবিতা বলতেন না কখনো, বলতেন দিনলিপি। ' আমি ত ভাই দিনলিপি লিখি'!   আর শিরোনামও দিতেন না, কারন কবিতা বা সেই দিনলিপি লেখার পরেই যেহেতু আসে শিরোনামের ভাবনা, তাই নিচে লিখতেন নাম। পাদনাম।    

জেঠুর সেই দিনলিপি-পূর্ণ খাতার সংখ্যা কতগুলি তা সঠিক আমিও জানিনা।  


   একজন কবির কবিতা অথবা দিনলিপিই যদি ধরে নিই তবে সেগুলিই তার যথেষ্ট পরিচয় ধরে নিয়ে কবিতা বিষয়ে কিছুই বলা হবে না এই লেখায়। এখানে সেই কবি মানুষটিকে কেমন দেখেছি, অথবা আমার নিজেরো জীবন কীভাবে স্পর্শ পেলো এইসব মানুষ,  প্রকৃতি, মাটির, তথা বিকাশজেঠু আর আমার একই অথচ ভিন্ন এক বিষ্ণুপুর কীভাবে গড়ে উঠল সারাজীবন ধরে, সেকথা বলেলে কিছুটা পরিস্কার হবে কি?

  ছিয়াশি বছরের জীবনে তিনি যত লেখা লিখেছেন তার অল্পই প্রকাশিত, এই বইএও সেই অল্প প্রকাশিত অপ্রকাশিত মিলিয়ে কবিকে ধরার চেষ্টা, যতটুকু হলে কবিকে চেনা যায়, ততটুকুই দেওয়া হল। যেটুকু ছাপার অক্ষরে রাখলে পাঠক এই প্রায় অজ্ঞাত বাংলা ভাষার কবিকে চিনে নিতে পারেন, ঠিক ততটুকুই চেষ্টা রাখা হল বিকাশ জেঠুর জীবন-চরিত্র মনে রেখে। 

  জীবন-চরিত্র বলছি কেন? কারন, নব্বইএর দশকে 'টেরাকোটা শহরের কবিতা' নামে এক সংকলনে স্থানীয় ১২ জন কবির সাথে তার ১৬ পৃষ্ঠার একটি পুস্তিকা একদা ছাপা হয়েছিল। প্রকাশক 'সমাকৃতি'। এই ব্যতিক্রম ছাড়া  ছিয়াশি বছরের দীর্ঘ জীবনে তিনি কবিতাগুলি দুই মলাটে সংরক্ষণের কোনো চেষ্টাই করেননি কখনো। কী বলব একে? লুকিয়ে থাকা স্বভাব?  নাকি বাংলা বাজারের প্রচলিত শব্দ 'প্রচার-বিমুখ'? অথবা অন্তরমুখিনতার মতো ভারি শব্দ দিয়েও ঠিক বোঝা যাবে না বিষয়টি। প্রথম জীবনে বুদ্ধবেদ বসুর কবিতা পত্রিকা অথাবা পরবর্তীতে 'কৃত্তিবাস' এবং তৎকালীন 'দেশ ' পত্রিকা তে যেমন লিখেছেন, তেমনি 'অনুবর্তন', তিরপূর্নি'র মতো নব্বইএর গুরুত্বপূর্ন অভিজাত ছোটপত্রিকাগুলিতেও, এরপরেও গাঁয়ে গঞ্জে   এমন কি পাড়ার কালীপুজার স্যুভেনির, কাউকে তিনি ফেরাননি কখনো।  অথচ থরে থরে 'দিনলিপি' ভরা খাতাগুলি সযত্নে তাকের উপরে সজ্জিত রইল চিরকাল। মলাট বন্দীর কথা ভাবা হল না কখনো।

   না, কোনো প্রচলিত শব্দ ব্যবহার দিয়ে এই ঘটনাকে ব্যখ্যা বা গ্লোরিফাই করার চেষ্টা করলে বিষয়টি লঘু হয়ে উঠবে। প্রচলিত মহত্বের ধারণাটি এখানে অচল। 

   বিষ্ণুপুর,  জেলা বাঁকুড়া,  লাল মাটির প্রান্তর, ডিহি,  এক রুখু কাঁটাঝোপ ক্যাক্টাস অধ্যুষিত প্রাচীন শহর। একদিকে বহু প্রাচীন  মল্ল্রাজাদের ঐতিহ্যের ইতিহাস, আর অন্যদিকে প্রকৃতিগত ভাবেই উদাসীন এক যাপন এখানের মানুষের স্বাভাবিক শ্রেণী চরিত্রের মতো। পাগল, নিষ্কর্মা, প্রায় কর্মহীন বেকার মানুষের মোড়ের আড্ডা, গুলজার হয়ে থাকা চায়ের দোকান, দারিদ্র,  আর সমস্ত কিছুকে ছাপিয়ে এক উদাসীস জীবনের বয়ে যাওয়া ছিল এই শহরে। সেই আড্ডায় অকৃতদার মধু জেঠু, বিষ্ণুপুর ঘরানার সেতার বাদক যেমন রয়েছেন তেমনি রয়েছেন প্রত্নতাত্ত্বিক চিত্তবাবু, ছেলেবেলায় সমস্ত পরিবার হারানো গম্ভীর গোবু বাবু, দরজি কাসেম, কমিউনিস্ট করা ছোকরার দল, আর এই ইটের দাঁত বেরোনো ছাদ খুলে যাওয়া দোকান ঘরে ছিল একদা ডাকাত পটু বদ্যির আস্তানা।  পুরনো আর বর্তমান মিশে যাওয়া এক আবহমানতা। 

  অন্যদিকে  যেকোনো অঞ্চলের অর্থনীতি সেখানের মানুষের যাপন চরিত্র নির্দিষ্ট করে দেয় হয়ত। বিলাসিতার সজ্ঞা কতদূর নেমে আসতে পারে তা তিরিশ বছর আগের বাঁকুড়া পুরুলিয়ার  গ্রামেও দেখা যেত,   জামার বোতাম অতিব্যবহারে ছিড়ে যাওয়ার পর তা বুকের দুপাশে ঝুলতে থাকাই ছিল নিয়ম। হাতে বোতাম টুকু লাগিয়ে নেওয়াও বিলাসিতা মাত্র। 

যেখানে নিজ খরচে কাব্য পুস্তিকা ছাপার মতো অকিঞ্চিৎকর ও  হাস্যকর কর্ম বোধকরি কেউ ভাবতেই পারেনা!    তাই সাতু জেঠু, বিকাশ দাশ,  পাড়ার বনেদী পরিবার দেওয়ানবাটীর ছোট ভাই। তিনি কবি। পাড়ার লোক দু একজন ছাড়া সে কথা কেউ জানে না, কাঁধে ঝোলা নিয়ে যেকোনো দিকের বাসে উঠে পড়তেন কোনো কোনোদিন। কন্ডাক্টর খালাসি সকলেই মুখচেনা। শহর ছাড়িয়ে শাল মহুয়ার জঙ্গলের মাঝে হঠাত ড্রাইভারকে বলতেন - একটু আস্তে ভাই, এইখানেই নামিয়ে দাও'।  ধুধু জঙ্গলের মাঝে তাকে নামিয়ে দিয়ে বাস চলে গেল বাঁক পেরিয়ে। 'এখন কোথায় যাব আমরা জেঠু?' 'এই ত, এখানেই'। বলে অল্প থেমে,  তিনি হাঁটেন। নতুন মুকুল এসেছে শালের, রঙ পালটে যাচ্ছে দেখো জঙ্গলের, প্রতি ঋতুতে তার রঙ রূপ গন্ধ পালটে পালটে যায়, কেউ দেখবে না! এখন এর মাঝ দিয়ে হেঁটে ফিরে যাব আমরা উলটো দিকের পথটুকু...। হ্যাঁ পিছনের পথ হেঁটে ফিরে যাওয়ার জন্য এখানে বাসে চড়ে আসা হল।

  এখানে,  এই এতদূর এসে এরপরেও কি মনে হবে?  কেন কোনো বই নেই আমৃত্যু! উদাসীনতা নয়, অন্তরমুখিনতাও নয়, এ হল মাটি-চরিত্র। একেক মাটি একেক রকম হয়।

   এইসব ঘটনা শুধু দিনলিপির আকারে লিখে রাখা আছে তার খাতার ভেতর।  



   একজন কবি তার জন্ম ও মৃত্যুর মাঝের সময়টুকু কীভাবে হেঁটে চলে বেড়ালেন, কীভাবে তার দেশ গ্রাম আর এই জগতকে দেখলেন, মানুষ কীভাবে তার কাছে এলো, তিনি কীভাবে তার কাছে পৌঁছালেন এই হল তার কবিজন্মের রহস্যরূপ! তার রেখাচিত্র তিনি রহস্যময় উপায়ে লিপিবদ্ধ করে রাখেন বলেই তিনি কবি, তিনি রহস্যময় হয়ে ওঠেন সকলের কাছেই, হয়ত নিজের কাছেও।  আর ক্রমশ এই সমস্ত জগতকে  নিজের ভেতর নিয়ে তিনি উদাসীন হয়ে ওঠেন ক্রমে। সংসারে স্ত্রী পুত্র কন্যা থাকলে সেই উদাসীনতা প্রায়শই ভেঙে ভেঙে যায়, যার সে বালাই নেই তিনি ক্রমেই আরো নিজের ভেতর তলিয়ে গিয়ে চুপ হয়ে যেতে থাকেন।  হয়ত সংসারে এই একা থাকার অভ্যাস বিকাশ জেঠুকে ক্রম-উদাসীন করে তুলেছিল নিজের প্রতি। 

    শেষ দশ বারোটি বছর আমি প্রায় প্রতিদিনের সান্ধ্য-সাক্ষাতে আর যেতে পারিনি জেঠুর ঘরে। আড্ডা বলতে একা অথবা অনুজ কবি বন্ধু শীতল,  অংশুমানের সঙ্গে।  বিষ্ণুপুর থেকে কিছুদূরে এক গ্রামে তখন থাকি সংসার নিয়ে। মাঝেমাঝে বাড়ি গিয়ে দেখা করি। দেখি কবি ক্রমশ দিগন্তের দিকে চলেছেন। একদিন শীতল ফোনে বলল জেঠু ভাল নেই, একবার এসো। পরেরদিন বিকেলে গেলাম।  সেই মাটির বারান্দা। ভাঙা সিঁড়ি দিয়ে দোতলার কোঠায়। একটা লোহার ফোল্ডিং খাটিয়ায় তিনি শুয়ে আছেন। তার মাটির শয়ন ভেঙে তাকে খাটিয়েয় দেওয়া হয়েছে। চির-অস্থিসার কবি শুয়ে আছেন, সম্পূর্ণ নগ্ন। ধুপের গন্ধ। জেঠু, আমি কৌশিক। তিনি দুহাত তুলে জোড় করলেন। জেঠু,  চাদরটা গায়ে দিয়ে দিই? তিনি দুহাত তুলে ধরলেন, যার অর্থ-- আর থাক ভাই। এই ভাল আছি। শূন্য দৃষ্টি উপরের দিকে। কিছুক্ষন স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইলাম। জেঠু কিছু বলবেন? তিনি মৃদু হাসলেন। পুনরায় হাত জোড় করলেন, অর্থাৎ-- বিদায়! 

   সিঁড়ি দিয়ে নেমে এসে প্রতিবারের মতোই দেখলাম শেষ ধাপে সেই খুলে রাখা দুটি প্লাস্টিকের চটি-- বিদায়! 

   


*

                --কৌশিক বাজারী

১আগস্ট, ২০১৯